স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টা
পরম পূজ্য দশম সংঘরাজ জ্যোতিঃপাল মহাথের
১৯১৪-২০০২
মহামান্য দশম সংঘরাজ জ্যোতিঃপাল মহাথের ১৯১৪ সালের ১৪ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩৫ সালে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মানবদরদি ও শিক্ষানুরাগী। এই গুণাবলি ধারণ করে পরিণত বয়সে তিনি ধর্ম, শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং অনাথ আশ্রমসহ মানবকল্যাণে নিবেদিত বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পণ্ডিত ও ত্রিপিটক বিশারদ। তাঁর বিপুল সাহিত্যকর্ম, গবেষণা ও অনুসন্ধান প্রমাণ করে কত বিষয়ে তিনি গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার অনেকগুলো এখন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অংশ। প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ মরমি গান চর্যাপদ নিয়ে তাঁর গবেষণা শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী, পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদদের আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের বৌদ্ধ ইতিহাসের কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই পণ্ডিত ছিলেন মানবতার মূর্ত প্রতীক। শান্তির অগ্রদূত হিসেবে তিনি “এশিয়ান পিস গোল্ড মেডেল” লাভ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একজন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংগঠক হিসেবে ভূমিকার জন্য তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান “স্বাধীনতা পুরস্কার” পান, আর মানবকল্যাণ ও সমাজসেবায় অবদানের জন্য পান “একুশে পদক”। মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আইএআরএফ (যুক্তরাজ্য) তাঁকে বিশ্বনাগরিকত্বের স্বীকৃতি দেয়; মিয়ানমার থেকে পান “অগ্গ-সদ্ধম্ম-জোতিকধজ” উপাধি। এ ছাড়া দেশে-বিদেশে আরও অসংখ্য সম্মাননা ও উপাধিতে তিনি ভূষিত হন।
দেশ-বিদেশের বৌদ্ধ ও আন্তঃধর্মীয় সেমিনার ও সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি বহুবার আমেরিকা, কানাডা, চীন, জাপান, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, সোভিয়েত ইউনিয়ন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মিয়ানমার ভ্রমণ করেছেন।
২০০২ সালের ১২ এপ্রিল ভারতের মুম্বাইয়ের জে. জে. হাসপাতালে ভদন্ত জ্যোতিঃপাল মহাথের পরিনির্বাণ লাভ করেন। ২০০৩ সালের ৯ ও ১০ জানুয়ারি তাঁর জন্মগ্রাম ও তাঁরই প্রতিষ্ঠিত পবিত্র তীর্থ কুমিল্লার লাকসামের বড়ইগাঁও কনক চৈত্য বৌদ্ধবিহারে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারসহ তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং অগণিত ভক্তসহ দেশ-বিদেশের সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন; গভীর শোকের সেই অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের এক বর্ণাঢ্য উদ্যাপন।