বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা অনালয়ো
বাংলাদেশে থাই স্থাপত্যরীতির প্রথম ও একমাত্র মহাচৈত্য, উদ্বোধন ২০১৭ সালে।
দশম সংঘরাজ পরম পূজ্য জ্যোতিঃপাল মহাথের বাংলাদেশের অন্যতম বৌদ্ধ তীর্থস্থান ময়নামতিতে ধ্যানমগ্ন হয়ে জীবনের বাকি সময় কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল সেখানে একটি সুউচ্চ বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা নির্মাণ করা, কিন্তু অর্থাভাবে জীবদ্দশায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। দশম সংঘরাজের ভাগ্নের নাতি এবং তাঁর আদর্শের ধারক ভদন্ত সুগতপ্রিয় ভিক্ষু গুরুদেবের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন। একাডেমি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তিনি থাই বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে একটি সুউচ্চ বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা নির্মাণের মহৎ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শুরুটা হয় ২০০১ সালের ২৩ অক্টোবর, যখন দশম সংঘরাজের জন্ম ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার স্মরণে বড়ইগাঁও কনক চৈত্য বিহারে থাইল্যান্ডের ভিক্ষু ও দাতাদের উপস্থিতিতে এক মনোজ্ঞ সংঘদান অনুষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালের ৫ নভেম্বর থাইল্যান্ডের রাজার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে মহাসমারোহে রাজকীয় থাই কঠিন চীবর দান উদ্যাপিত হয়। এসব অনুষ্ঠানে আসা থাইল্যান্ডের বিজ্ঞ ভিক্ষু ও অতিথিরা ময়নামতির প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতা, প্রত্নসম্পদ এবং নব শালবন বিহার দেখে মুগ্ধ হন। ধীরে ধীরে এর খ্যাতি ধর্মপ্রাণ থাইদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে থাইল্যান্ডের ধ্যানাচার্য ও বুদ্ধের ধর্ম প্রচারে নিবেদিতপ্রাণ সংঘমাতা শ্রীমতী চিত্রা পেতভং এবং অন্যান্য সহযোগীর মাধ্যমে।
২০১১ সালের ২০ অক্টোবর নব শালবন বিহারে পরম আরাধ্য সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার উপস্থিতিতে গভীর ভাবগাম্ভীর্যে বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা অনালয়োর ভিত্তি স্থাপন করা হয়। থাই স্থপতি মি. সুরচাই এবং প্রকৌশলী অধ্যাপক মি. প্রাগন থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ স্থাপত্যরীতিতে প্যাগোডার একটি সুন্দর নকশা তৈরি করেন। বন্ধুপ্রতিম থাইল্যান্ডের ওয়াট ফুত্থাবুচার অধ্যক্ষ পরম শ্রদ্ধেয় ফ্রা থেপ মংকলইয়ান নেপথ্যে থেকে সেখানকার অনুসারী ও ভক্তদের অনুপ্রাণিত করেছেন। বিশ্ব শান্তি প্যাগোডা অনালয়ো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নব শালবন বিহারকে আন্তর্জাতিক মানের মহাবিহারে রূপান্তরে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
নির্মাণকাজ তদারকির জন্য স্থানীয়ভাবে একটি কারিগরি দল গঠন করা হয়: সভাপতি বিহারের অধ্যক্ষ কর্মবীর ভদন্ত শীলভদ্র মহাথের, সদস্য প্রকৌশলী যতীশ সিংহ, স্থপতি বিশ্বজিৎ বড়ুয়া ও প্রকৌশলী স্বপন চন্দ্র সিংহ। আর্থিক বিষয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা বাবু তপন কুমার সিংহ ও সুরসেন সিংহকে সহকারী, বাবু মনহরি সিংহকে হিসাবরক্ষক এবং বিজয় সেন সিংহ ও সুজিত চন্দ্র সিংহকে কেনাকাটার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০১৩ সালের ৬ অক্টোবর বাংলাদেশে থাই দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ফাসিত চুদাবুদ্ধি, কুমিল্লার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, সংঘরাজ জ্যোতিঃপাল মহাথের ফাউন্ডেশনের সভাপতি এস. কে. চৌধুরী, থাইল্যান্ডের অতিথিবৃন্দ এবং বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক ভিক্ষু ও সম্মানিত নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে প্যাগোডার নির্মাণকাজ শুরু হয়। ধাপে ধাপে নির্মাণকাজ চলতে থাকে। ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হাসানুজ্জামান কল্লোল, থাইল্যান্ডের ৭৫ জন পুণ্যার্থী এবং মন্ত্রোচ্চারণরত হাজারো বৌদ্ধ নর-নারীর উপস্থিতিতে থাইল্যান্ড থেকে আনা ৩০ ফুট উঁচু ধাতব বুদ্ধমূর্তি প্যাগোডায় স্থাপন করা হয়। সেটি ছিল আমাদের জন্য আরেকটি স্মরণীয় দিন।
টানা ছয় বছরের নিরলস কাজের পর প্যাগোডা ধীরে ধীরে নান্দনিক রূপ পায়। বুদ্ধবেদির নিচে পবিত্র পাথরে খোদিত বুদ্ধের পদচিহ্ন স্থাপন করা হয়েছে, যাতে যে কেউ সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করে শান্তি পেতে পারেন। নিচতলায় চমৎকার কারুকাজ ও আলোকসজ্জায় ধ্যানের উপযোগী একটি হলঘর তৈরি করা হয়েছে, যেখানে যে কেউ যেকোনো সময় শান্ত, নির্মল পরিবেশে কিছুক্ষণ ধ্যানে বসতে পারেন। নিচতলার তিন দিকে তিনটি সিংহদ্বার, দোতলায় বুদ্ধবেদির নিচে একটি এবং প্রার্থনা হলের চার দিকে আরও চারটি সিংহদ্বার রয়েছে। প্যাগোডার পাঁচটি চৈত্যের মধ্যে চারটি দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। থাইল্যান্ড থেকে আনা সোনালি আভায় ভরা প্রধান চৈত্যটি ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল পবিত্র ধাতুসহ আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপন করা হয়। প্যাগোডার ভেতরে স্থাপিত অষ্টধাতুর প্রধান বুদ্ধমূর্তিটি ভারতের বারাণসী জাদুঘরে সংরক্ষিত ধর্মচক্র মুদ্রার বুদ্ধমূর্তির আদলে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে তৈরি।
২০১৭ সালের ২১ অক্টোবর প্যাগোডার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। এরপর থেকে চীন, জাপান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভুটান ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতরা নব শালবন বিহার পরিদর্শন করেছেন, এবং দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় দেশি-বিদেশি পর্যটকরা নিয়মিত এখানে আসছেন। এই প্যাগোডা নির্মাণের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের স্বপ্নের পথে আরেক ধাপ এগিয়েছি।
আরও প্রকল্প
শালবন বিহার অনাথালয়
১২০টি অনাথ ও দুস্থ শিশুর খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা ও পরিচর্যা।
প্রকল্পটি দেখুন
শালবন বিহার গেস্ট হাউস
পুলিশ-সুরক্ষিত নিরাপদ প্রাঙ্গণে গবেষক, পণ্ডিত ও পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা।
প্রকল্পটি দেখুন
শ্রামণ ও ভিক্ষু প্রশিক্ষণ ও ধ্যান কেন্দ্র
নবদীক্ষিত শ্রামণ ও ভিক্ষুদের জন্য বিনয়, ত্রিপিটক ও ধ্যান বিষয়ে প্রশিক্ষণ।
প্রকল্পটি দেখুন